Diary of a COVID-19 Patient (Last Part)

2
183
Hats off to those who are saving lives.
Courtesy The Hindu newspaper.

“Humanity College ” কে দেওয়া আমার অসুস্থতা বিষয়ক লেখার শেষ পর্ব। — By Motiyur Rahman (Writer is a professor of Botany at Sundarban Hazi Desarat College, Pathankhali, West Bengal)

 ***********************************
ব্যক্তিগত চিকিৎসকের পরামর্শ ও চিকিৎসা যখন কাজ করলো না এবং জ্বরও ছাড়লো না তখন ডাক্তারবাবু বললেন যে, ফুসফুসে ইনফেকশন হয়েছে বেশ ভালো মতোই । এই লড়াইয়ের এক চরম অবস্থা পর্যন্ত আমি বাড়িতেই ছিলাম। বাড়িতে থাকার সাহস যুগিয়ে ছিলেন ডাক্তারবাবু। যদিও আমার জায়গায় অন্যকেউ হলে হয়তো অনেক আগেই চলে যেতেন হসপিটাল কিম্বা নার্সিং হোমে। যাইহোক ৮ / ৯ দিনের পর আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে,  আর বাড়িতে থাকা ঠিক হবে না। 

আমার তেইশ বছরের ছেলে যে দূরের এক শহরে ইন্টার্ন ডাক্তার সে রাত ন’টায় মায়ের ফোন পেয়ে তার কাজ রেখে রাতারাতি চলে এলো বাবাকে হসপিটালে ভর্তি করাতে । কিছু টেলিফোনিক পরামর্শ ছাড়া সেই মুহূর্তে অন্যকিছু সে পেল না কারো কাছ থেকে । পাওয়ার কথাও না। তা কোনোভাবেই আশাকরাও যায় না তখন কারো কাছ থেকেই । করোনা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই কতইনা সঠিক বেঠিক খবর আর গল্প  শুনছি – মা-বাবার করোনা হয়েছে সন্তান এগোচ্ছে না। সেখানে তো আত্মীয় এবং বন্ধুদের আসার কোনো কথাই আসে না।

আসল কথা হলো আতঙ্ক বা ভয় রাখার কোন জায়গা নেই মানুষের। নিজের চরম বিপদ দেখলে মানুষ যে কেমন আচরণ করবে তা হয়তো সে নিজেও জানে না। এমনকি আমিও তার ব্যতিক্রমও না। তাই কারো দোষ দেখি নি এবং এখনো দেখিও না। দেখা উচিতও না। দেখলে তা যুক্তির বিরুদ্ধে যায় এবং অন্যের প্রতি অবিচার করা হয়। 

পিছনে এক সপ্তাহ রোগভোগের পর ২২ শে জুন ২০২০ আমার ছেলে আমাকে ভর্তি করে দিল বি. পি পোদ্দার হসপিটালে।  ডাঃ রাজদীপ সেন প্রকৃত চিকিৎসক ও মহান মানুষ, চিকিৎসা করলেন আর আমার ছেলের পরিচয় জানার পর তাকে ছোট ভাইয়ের মতো করে কিছু উপদেশ এবং  পরামর্শ দিলেন। প্রাইভেট এই হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু বলছি না । এক কথায় বলছি –  যেমন হয় ।
 
২৬ শে জুন তারা জানায় আমি কোভিড পজিটিভ। সঙ্গে সঙ্গে আমার ছেলে, মেয়ে ও জামাতা ব্যবস্থা করেই ফেলে আমাকে বেলেঘাটা আই ডি হসপিটালের সি সি ইউ তে আনার। ২৭ শে জুন থেকে ১ লা জুলাই পর্যন্ত ছিলাম সেখানে। অসাধারণ চিকিৎসা পরিসেবা দিয়েছেন তাঁরা। সরকারী হাসপাতালে বিনা পয়সার এমন চিকিৎসার অভিজ্ঞতা আমার ও আমাদের ছিল না। পুরো কভিড পজিটিভ ও মারাত্মক বিপন্ন মানুষদের নিয়ে কাজ করছে এই হাসপাতাল। তাঁদের পরিকাঠামো ও পরিসেবা চমৎকার। ভীষণ মানবিকও । প্রতিটি রোগীর বিছানা, জামা, পায়জামা, তোয়ালে, সাবান, পেষ্ট, ব্রাশ, সেভিং ফোম, জিলেট রেজার, চটি ও স্যানিটাইজার সহ নানান দরকারি জিনিসের প্রাত্যহিক ফ্রেশ যোগান। সাথে প্রতিদিন ভালো খাবার, টিফিন এবং অবশ্যই ওষুধপত্র এবং  দেখভাল । 

আপাদমস্তক পলিথিন কভারে মোড়া ডাক্তার ও নার্সদের দৃঢ় চলাফেরা ও পরিসেবা দান রোগীর মনে বল এনে দেয় যে, তারা একটা মারাত্মক লড়াইয়ের মধ্যেই আছেন। তাঁদের সেই ইতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে রোগীর দেহে ও মনে এবং জ্বর জ্বালা কম হয়। অন্তত এইক্ষেত্রে ও এই মুহূর্তে পার্থক্য বুঝতে অসুবিধা হয় না বেসরকারি ও সরকারি হাসপাতালের মানসিকতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে । পরিকাঠামো ও পরিসেবা দুটির সাহায্যে সত্যিই তাঁরা কোভিড -১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন দেশ, জাতি ও মানুষের জন্য। তার ফলও মিলছে। প্রতিদিন মানুষ মৃত্যুর সীমারেখা কিম্বা প্রান্তদেশ থেকে জীবনে ফিরছেন, ফিরছেন নিজের বাড়িতেও। 

যদিও দশ দিনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি দীর্ঘদিনের সুগার, প্রেশার ও অন্যান্য নানা জটিল রোগে ভোগা এবং বেশি বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে কোভিড যুদ্ধ অনেকটা কঠিনতম এক লড়াই তবুও তাও সম্ভব হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ।  বাইরের সামাজিক পটভূমিকায়  “কোভিড ” বা করোনা  নামে যে আতঙ্ক তা আতঙ্কই ।  যদিও একথা বারবার মনে রাখতে হবে যে, করোনার আসল সমস্যাটি হলো তার ইনফেকশন বা সংক্রমণের ধরনে এবং ইনফেকশন পরবর্তী দু সপ্তাহের অসুস্থতাতেই  । 

যাইহোক, বাড়ি ও দুই হাসপাতালের রোগভোগের দিনের হিসাব ও আমার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে বেলেঘাটা আই ডি হসপিটালের ডাক্তারবাবুরা আমার ছুটি দিয়ে দেন এবং সরকারি এম্বুলেন্স দিয়ে বাড়িতেও দিয়ে যাওযার ব্যবস্থা করেন। ডিসচার্জ ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থাও করেন প্রশাসন ।যদিও উন্নত মন ও বিজ্ঞান সম্মত মানসিকতার আমাদের শিক্ষক বন্ধু, ১১ নং ওয়ার্ডের পৌরপিতা মোজাফফর আহমদ ও তাঁর পুত্রের ব্যক্তিগত সহযোগিতা এবং স্থানীয় বহু মানুষের অবদান ও সহানুভূতি এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উল্লেখযোগ্য স্থানীয় বহু মানুষ সহ  উদার ও পরিশীলিত বেশ কিছু মানুষের মানবিক মুখ ও মনোভাব যা আমাদের সব প্রয়োজন মিটিয়েছে । আমি ও আমার পরিবার এ ব্যাপারে তাঁদের কাছে অবশ্যই চিরকৃতজ্ঞ। 

অবশেষে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু কথা বলি – কোভিড পজিটিভ হলেও তার যথেষ্ট চিকিৎসা আছে। পাশে আছে বেসরকারি ও সরকারি চিকিৎসালয় । তাই আতঙ্কিত হবেন না।  আক্রান্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাহায্য নিন। 
কমবেশি পঞ্চাশ বছরের নীচের বয়সের মানুষের কোভিডের সম্ভাবনা বা জীবনহানির সম্ভাবনা অনেক কম । আর যদি আক্রান্ত হয়ও তাহলে তারা দ্রুতই আরোগ্য লাভ করছেন ৷ 


করোনা ভাইরাস আজ সারা পৃথিবীতে যেভাবে ছড়িয়েছে এবং এখনো পর্যন্ত যেহেতু এর কোন প্রতিষেধক বার হলো না তাই একে নিয়েই মানুষকে থাকতে হবে। এর চেয়ে বাস্তব কথা এই মুহূর্তে আর কিছু নেই । ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সাবধানতার অবশ্যই দরকার। তা থাকার পরও কিন্তু বহু বহু মানুষকে এর কবলে পড়তে হতে পারে। এটাও বাস্তব সত্য এবং তা খুব স্বাভাবিকও । শুধু আমরা জানি না যে, আমরা কে কখন ও কীভাবে তার কবলে পড়ব। আজ যিনি অনেক কথা বলছেন কাল তিনিই হতে পারেন কোভিড পজিটিভ । ব্যক্তিগত জীবনযাপন, বাজার  ও ওষুধপত্র আমাদের সবার চাই-ই চাই । বাইরে আমাদের আসতেই হবে। তাই সুরক্ষা ব্যক্তিগতভাবে নিলেও কখনোই নিশ্চিত হওয়া যায় না যে সেই সুরক্ষাই শেষ কথা বলবে। সেজন্য সকলকেই বিনীতভাবে বলি – ভয় না,  সবার আগে জয় করতে হবে করোনার আতঙ্ককে ।  জানতে ও বুঝতে হবে করোনা ভাইরাসের ধরন ও তার রোগ সংক্রমণের ধারা বা পদ্ধতিকে। তবুও বলছি, এই সব মিলিয়েও কোভিড আতঙ্কের পাশাপাশি আমাদের সামনে থাকতে পারে এক অপেক্ষাকৃত কম আতঙ্কের পরিবেশ যা সচেতনতা দিয়ে তৈরি করতে হবে আমাদেরকেই। তাই আসুন অভূতপূর্ব এই রোগের অপ্রকৃত ও আজগুবি সব ভয়গুলোকে আগে জয় করি ।

অনেক কথা বলা হলেও আর একটি  কথা না উল্লেখ করলে মানুষ হিসাব খাটো হয়ে যাব। ৩০ / ৩৫ বছর আগের আমার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বর্ষীয়ান শিক্ষক শিক্ষিকা , যেখানে কাজ করছি সেই কলেজের প্রাক্তন ও বর্তমান একাধিক অধ্যক্ষ,  অধ্যাপক সমিতির ঘনিষ্ঠ স্বজন, ছাত্রছাত্রী এবং সহকর্মী সহ নানাস্তরের বন্ধু ও লেখালেখির জগতের প্রিয় মানুষদের যে ভালোবাসা ও দৈনন্দিন খোঁজ খবর আমি পেয়েছি বা আমার পরিবার পেয়েছে তার জন্য সকলের কাছে রইল আজীবনের কৃতজ্ঞতা।

শ্রদ্ধেয় এইসব মানুষ যাঁরা দেশে আছেন তাঁরা তো বটেই কিন্তু এই মারাত্মক সময়েও আমেরিকাতে বসে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে আমার উপর নজর রেখেছিলেন আমার শ্রদ্ধাভাজন ও প্রণম্য অধ্যাপক ডঃ পার্থ বন্দোপাধ্যায়। একটা মানুষের জীবনে এই প্রাপ্তি অনেক অনেক বড় এক প্রাপ্তি। আমি তো মনেকরি এটিই জীবনের শ্রেষ্ঠতম প্রাপ্তিই । শিক্ষক সংগঠনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও স্বজনেরা যা করেছেন তা ভোলা যাবে না এ জীবনে। তাই সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। হয়তো এইজন্যই কঠিনতম এক যাত্রাপথ অনেক সহজ হয়ে গেছে। 

যাওয়া কিম্বা আসা তো প্রাকৃতিক নিয়ম এবং তা অবধারিত এক সত্যও । কিন্তু মাঝখানে যা থাকে তা কেবল এই মানবিক প্রীতি ও ভালোবাসাই। এই অমূল্য মানবিক প্রীতি ও ভালোবাসার মূল্য ও মর্যাদা যেন এ জীবনে কোনোদিনও না ভুলি ৷ 
সকলের দৈহিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য কামনা করি । ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন ও নিরাপদ থাকুন সবাই। সকলের জন্য রইল আমার আন্তরিক শুভকামনা। ব্যক্তিগত সচেতনতা, সাবধানতা যেন সহজ ও নিরাপদ করে আমাদের সবার জীবনযাপনকে ৷ 

কেবল ভয় না,  আসুন কোভিডের ভয়কে জয় করেই বাঁচি । 

2 COMMENTS

  1. খুব দরকারি লেখা। মতিউরবাবুর প্রত‍্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনা অনেক মানুষকে ভয় কাটাতে সাহায্য করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here