নির্বিচারে কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার নতুন অধ্যায় ও আমেরিকার উত্তাল জনআন্দোলন।

0
54

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
(লেখক নিউ ইয়র্কে মানবাধিকার কর্মী, লেখক ও শ্রমিক শিক্ষক।)

ব্রুকলিন, এনওয়াইতে বিক্ষোভকারীরা

সেই ১৯৬৮ সালে রেভারেণ্ড মার্টিন লুথার কিংয়ের হত্যার পর যে বিশাল জনরোষ আমেরিকার বিবেককে ঝুঁটি ধরে নাড়া দিয়ে গিয়েছিলো, আজ এই ২০২০ সালে করোনাভাইরাস ক্রান্তিকালের মধ্যে আবার যেন একবার সেই জনরোষের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি। আজ এই ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্য সঙ্কটের মধ্যেও লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের জরুরি প্রয়োজনকে অগ্রাহ্য করে লক্ষ লক্ষ যুবক যুবতী রাস্তায় নেমে এসেছে এক নিরীহ কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েডের ওপর পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানাতে। মিনিয়াপোলিস শহরে নিরস্ত্র ফ্লয়েডের উপর সশস্ত্র পুলিশ অফিসারের হাঁটু দিয়ে গলা টিপে ধরে মেরে ফেলার ছবি এখন পৃথিবীর সর্বত্র ভাইরাল। মানুষ স্তম্ভিত হয়ে গেছে আমেরিকার এই চেহারা দেখে। হৃদয়বান মানুষ যাঁরা, তাঁরা চোখের জল মুছেছেন।

আজ এই ঘটনার প্রতিবাদে আমেরিকার সর্বত্র তীব্র জনরোষ — মিনিয়াপোলিস থেকে পাশের শিকাগো, সেখান থেকে আমাদের নিউ ইয়র্ক, রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি, আর পশ্চিমে লস এঞ্জেলেস, সানফ্রান্সিসকো, দক্ষিণে হিউস্টন ও ডালাস, এমনকি ছোট ছোট শহর — যেসব জায়গায় পুলিশি অত্যাচার ও হত্যার ঘটনা বহুবার ঘটেছে। এর মধ্যে আছে সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টন, যেখানে এই একই ভাবে ২০১৪ সালে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক মাইকেল ব্রাউনকে পুলিশ গুলি চালিয়ে মেরে ফেলেছিলো। আছে নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্ক্স, যেখানে আফ্রিকার গিনি থেকে পড়তে আসা যুবক আমাদু দিয়ালোকে বিনা কারণে পুলিশ রাতের অন্ধকারে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিলো। আছে নিউ ইয়র্কের কুইন্স, যেখানে বিয়ের আগের রাতে ব্যাচেলর্স পার্টি করে বেরোনোর সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক শন বেলকে পুলিশ সাবমেশিনগান চালিয়ে তার জীবনের স্বপ্নকে চিরকালের মতো শেষ করে দিয়েছিলো। কেবলমাত্র ২০১৫ সালেই আমেরিকার পুলিশ একশোর বেশি নিরস্ত্র মানুষকে বিনা বিচারে খুন করেছে আমেরিকায়।

আমেরিকার কালো মানুষরা অনেক অত্যাচার সহ্য করেছেন চারশো বছর ধরে।দুশো বছর ধরে দাসপ্রথা নামক অবিশ্বাস্য বর্বরতার শিকার হয়েছেন। তারপর আরো একশো বছর শিকার হয়েছেন তীব্র বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণের। মানবিক অধিকার হরণ করা হয়েছে তাঁদের নিষ্ঠুরভাবে। নিজের চোখে দেখে এসেছি দক্ষিণ ইলিনয় অঞ্চলে পাঁচ বছর বাস করার সময়ে — কীভাবে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের জন্যে বাথরুম, এমনকি জলের কল পর্যন্ত আলাদা ছিল। দেখে আশ্চর্য হয়েছি। মনে পড়েছে আমাদের দেশে উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের জাতিভেদের বীভৎসতা। যার বিরুদ্ধে বহুকাল ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন করে এসেছেন আমাদের দেশের মনীষীরা — ভীমরাও আম্বেদকর, জ্যোতিরাও ফুলে, আর আমাদের বাংলার স্বামী বিবেকানন্দ, রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ। ভগবান শ্রীচৈতন্য। আজকে আমরা হিন্দুধর্মের মৌলবাদ মনে রেখেছি, কিন্তু জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে মহামানবদের শিক্ষার কথা ভুলে গেছি।  

ভুলে গেছি রবীন্দ্রনাথের অমোঘ বাণী — “মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছো যারে, সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবে ক্রোড়ে দাও নাই স্থান, মৃত্যুমাঝে হতে হবে চিতাভস্মে সবার সমান।” দুই মানবতাবাদী ধর্মপ্রচারক — ভারতবর্ষে স্বামী বিবেকানন্দ, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রেভারেণ্ড মার্টিন লুথার কিং — দুজনেই বেঁচেছিলেন মাত্র উনচল্লিশ বছর। সেই স্বল্পায়ু জীবনে দুজনেই আমাদের চেতনাকে চিরকালের মতো বদলে দিয়ে গেছেন। অন্ততঃ, বদলে দিয়ে যাবার কথা ছিল। ওদেশে, এবং এই আমেরিকায়। অথবা ইউরোপে। ভারতীয় ও বাঙালি প্রবাসীদের প্রবল কৃষ্ণাঙ্গ-বিদ্বেষ দেখলে অবশ্য তা মনে হয়না।

হ্যাঁ, আজকের আমেরিকায় এই প্রবল জনরোষে এখানে ওখানে কিছু ভায়োলেন্স দেখা যাচ্ছে। যাবেই। মানুষ যন্ত্রণায় মাথা খুঁড়ছে। দু মাসে আমেরিকায় এক লক্ষের বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে শেষ হয়ে গেছেন। এই তথাকথিত স্বপ্নের দেশে আজ মৃত্যুর মিছিল। গণকবর দেওয়া হচ্ছে জায়গার অভাবে। মৃত্যুর সময়ে শেষবারের মতো দেখা করতে পারছেননা প্রিয়জনেরা। মর্গের অভাবে বড় বড় রেফ্রিজারেটরে রেখে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার মৃতদেহ। বিশাল বিশাল ট্রাকে সেসব মানুষকে আমাদের এই ব্রুকলিনের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়েই মাঝে মাঝে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শেষকৃত্যের জন্যে। আমরা তার নীরব সাক্ষী। মানুষ ভেঙে পড়ছে। মানুষ রাগে  ফুঁসছে। এই এক লক্ষ মানুষের এক বিরাট অংশই কৃষ্ণাঙ্গ। যাদের কথা আমেরিকার শাসকশ্রেণী ভাবেনা। যারা সারা জীবন দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও কুস্বাস্থ্যের শিকার। যাদের বসবাস করার এলাকায় পরিবহণব্যবস্থা হাস্যকর। যাদের এলাকায় সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো একের পর এক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাদের এলাকায় ড্রাগের আসক্তিতে মানুষকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। যাদের হাউসিং প্রজেক্টে আমেরিকার ভয়ঙ্কর সশস্ত্র পুলিশবাহিনী ঢুকে গিয়ে যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো মানুষকে খুন করতে পারে — বিনা তদন্তে, বিনা বিচারে। আর নয়তো, ভাগ্য সহায় থাকলে টেনে নিয়ে গিয়ে আমেরিকার মুনাফাভিত্তিক প্রাইভেট কারাগারে ছুঁড়ে ফেলতে পারে বাকি জীবনের জন্যে। যে প্রাইভেট জেল এখন আমাদের দেশেও নানা জায়গায় তৈরী হচ্ছে। এই সাদৃশ্যগুলো কেবলমাত্র কাকতালীয় নয়।

হিংসা ও লুঠপাটকে সমর্থন করিনা। কিন্তু আমেরিকার কোণে কোণে, শহরে উপশহরে রাস্তায় পার্কে হাটে বাজারে  অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ ও প্রতিবাদকে একশো ভাগ সমর্থন করি। এই আমেরিকাকে আমি চিনি। এই আমেরিকার জন্যে আমি গর্বিত।

মেমফিস শহরে ডক্টর কিংয়ের হত্যার সময়ে আমি এদেশে ছিলামনা। যাঁরা ছিলেন, তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন কী তীব্র শোক এদেশের বিবেকবান মানুষকে গ্রাস করেছিল। কী শোকতাড়িত আন্দোলন মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে নিয়ে এসেছিলো। তার মধ্যে শুধু কৃষ্ণাঙ্গরাই ছিলোনা। ছিল শ্বেতাঙ্গরাও। ঠিক যেমন পরিবেশ ও জলবায়ু আন্দোলনে আমরা দেখেছি সমস্ত বর্ণের ও ধর্মের মানুষকে সামিল হতে, ঠিক যেমন আমরা দেখেছি ৯/১১’এর সন্ত্রাসী হামলার পরে গরিব নির্দোষ ইমিগ্রেন্টদের বিনা বিচারে টেনে নিয়ে গিয়ে জেলে বন্দি করে রাখার অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে, ঠিক যেমন আমরা দেখেছি ইরাক যুদ্ধ বন্ধ করার জন্যে লক্ষ লক্ষ আমেরিকানকে মাইনাস দশ ডিগ্রির অবিশ্বাস্য শীতের মধ্যে রাস্তায় নেমে মিছিল সমাবেশ করতে।

আমেরিকার বিবেকবান জনসমুদ্রের সেসব মিছিলে আমিও থেকেছি। আজও আছি। তীব্রভাবেই আছি। এই আমেরিকার কথা আমাদের দেশের মানুষ জানেনা। জানা দরকার। কারণ সমস্ত ঘটনারই প্রতিচ্ছবি আমাদের দেশে আজ দেখতে পাচ্ছি।

এই অহিংস জনসমুদ্রের জোয়ার যে কোনো অত্যাচারী, মিথ্যাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকশ্রেণীর গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে পারে। এই হলো ইতিহাসের শিক্ষা।

#ParthaBanerjeePost
Brooklyn, New York

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here