ভারতের নির্বাচনের ফলাফল — মগজধোলাই আর ধর্মান্ধতার জয়।

0
630

কী কারণে এমন হলো, একটু দেখে নেওয়া যাক। ভুলে যাবার আগে।
অবশেষে দেখা গেল, শাসক শ্রেণী ও তাদের মিডিয়ার অষ্টপ্রহর গোয়েবলস অপপ্রচার আর মিথ্যাচার সাধারণ মানুষের মগজধোলাইয়ে পুরোপুরি ভাবে সফল। দেশ এখন আবার সরকারি ভাবে ধর্মান্ধদের দখলে। সাধারণ মানুষ অর্থাৎ 99% আজ হিন্দু ধর্মান্ধতা, লাগামছাড়া কর্পোরেট পুঁজিবাদ, হিংসা ও ঘৃণার রাজনীতি, ফ্যাসিজমের পক্ষে রায় দিয়েছে।
পুলওয়ামা সন্ত্রাসে ভারতীয় সেনাদের মৃত্যু, যুদ্ধজিগির, উগ্র দেশপ্রেমের টনিকে খাদ্য, শিক্ষা, অর্থনীতি, দারিদ্র্য, রাস্তাঘাটে বাচ্চাদের পড়ে থাকা — এসব real life issue থেকে মানুষের মনকে ঘুরিয়ে দেওয়া হল।
বেকারিত্ব, চাষিদের আত্মহত্যা, রাস্তাঘাটে, গ্রামেগঞ্জে মেয়েদের ধর্ষণ, মুসলমানদের ওপর, দলিতদের ওপর বর্বর অত্যাচার, ভয়ঙ্কর পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যসঙ্কট, জিনিষপত্র ও পরিবহণের আকাশচুম্বী খরচ, ব্যাংকের সুদ দ্রুত কমিয়ে দেওয়া, দেশজ শিল্প ও কৃষির বিপর্যয়, অর্থনীতির সম্পূর্ণ বেদখল হওয়া, ইত্যাদি অতি জরুরী বিষয় নিয়ে নির্বাচন নামক এই প্রহসনে কোনো আলোচনাই হলোনা।
মানুষের দৃষ্টি নোটবন্দী, জিএসটি, আধার কার্ড এসব থেকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেওয়া হলো। তথ্য, যুক্তি, বিশ্লেষণ এসব অপপ্রচার আর মিথ্যাচারের তোড়ে ভেসে গেল খড়কুটোর মত। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মত সেরকম কোন বিপক্ষ শক্তিও আর থাকল না।
কর্পোরেট মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া অতি সফলভাবে নরেন্দ্র মোদীকে একমাত্র নেতা এবং বিজেপিকে একমাত্র দল হিসেবে প্রজেক্ট করতে সক্ষম হলো। ঠিক এই আমেরিকার মতই একপেশে প্রচার হলো। বিরোধী দলগুলোর সেরকম কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নেতা বা নেত্রীও দেখা গেলোনা, বা প্রকৃতভাবে একজোট হয়ে লড়াই করার কোনো আকাঙ্ক্ষাও দেখা গেলোনা। রাহুল গান্ধী ও তার পরিবারকে মানুষ অল্টারনেটিভ নেতৃত্ব বলে স্বীকার করতে, মেনে নিতে পারলোনা। রাহুল গান্ধী নিজে নির্বাচনে পরাজিত হলেন। শিক্ষাগত যোগ্যতা ভাঁড়িয়ে, ক্রিমিনাল রেকর্ড চাপা দিয়ে, এবং প্রকাশ্যে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী উক্তি করেও বিজেপি নেতা ও নেত্রীরা রমরম করে নির্বাচনে জয়লাভ করলেন।
হিন্দি প্রচার, হিন্দু সংখ্যাগুরুত্বের, এবং পুরুষতান্ত্রিকতার জয় হলো। এই জয় আরো বেশি প্রকট হয়েছে অহিন্দিভাষী দক্ষিণী রাজ্যগুলোতে বিজেপির এই ঝড় সম্পূর্ণ রোধের মধ্যে দিয়ে। কেরালা, তামিলনাডু এবং অন্ধ্রতে এই তুমুল বিজেপি ঝড়েও কোনো দাগ কাটেনি। কেরালায় বিজেপি একটাও কেন্দ্রে জেতেনি। ওড়িশাতেও নবীন পটনায়েকের দুর্গ অক্ষত আছে।
পশ্চিমবাংলায় সিপিএম ও কমিউনিস্ট পার্টি উড়ে চলে গেছে। তাদের অপশাসন, গুণ্ডাবাজি ও প্রাচীনপন্থী, পুঁজিবিরোধী অপশাসনের ফলে তৃণমূল এসেছিলো। এখন তৃণমূলের চরম অশিক্ষা, অপশাসন ও দুর্নীতির ফলে বিজেপির ক্ষমতায় আসা শুধু সময়ের অপেক্ষা।
বাংলায় বিজেপি রাজ্য সরকার! দুবার কি তিনবার কথাটা নিজের মনে মনে উচ্চারণ করে দেখুন, কেমন লাগে।
‌__________________________
ধন্যবাদ কংগ্রেস পার্টি ও গান্ধী পরিবারকে, আপনাদের‌ দীর্ঘদিনের অপশাসন, অক্ষমতা, মিথ্যে প্রতিশ্রুতিকে। আপনাদের পারিবারিক রাজতন্ত্রকে।
ধন্যবাদ কমিউনিস্ট পার্টি, আপনাদের সীমাহীন ঔদ্ধত্য আর গুন্ডাবাজীর রাজনীতিকে।পশ্চিমবঙ্গকে উচ্চমেধা থেকে নিম্নমেধা করে তোলার অসীম ক্ষমতাকে।
আর পশ্চিমবঙ্গ নামক একসময়ের উদারপন্থী, প্রগতিশীল রাজ্যে খাল কেটে কুমির আসার রাস্তা তৈরী করে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ তৃণমূল‌ কংগ্রেসকে।
__________________________
আমার প্রিয় দুই দেশ ভারত — আমার জন্মস্থান, যেখানে আমি জন্মেছি, বড় হয়েছি, বাংলা ভাষা, গান, মানুষ কে ভালোবাসতে শিখেছি, আর আমেরিকা — কর্মস্থান, যেখানে আমার বাকী জীবন কাটছে, বাকী জীবনটা আমি এই দুটো দেশেই ফ্যাসিস্ট শাসকদের অধীনে কাটাব।
এই দুই দেশে থাকা আমার পরিবার পরিজন, সন্তান, হাজার বন্ধুবান্ধব সবাই এই প্রগৈতিহাসিক‌ মানসিকতার রেসিস্ট, সেক্সিস্ট শাসকদের ঠিক করে দেওয়া নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য হবে।
‌‌ “প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদে সেঁকে চামড়া।”
আমি নিশ্চিত, এখন আবার হিটলার, মুসোলিনি, ফ্রাঙ্কো, কু ক্লাক্স ক্ল্যানের দিন সমাসন্ন। নিষ্ঠুর,অন্ধকার শক্তিরা‌ আমাদের গ্রাস করতে আসছে। আবারও সারা পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ, রক্তক্ষয়, হিংসার আবহ তৈরী হবে।
এর সাথে যোগ হবে বিপজ্জনক হারে জলবায়ুর পরিবর্তন, মানুষের মৃত্যু, ভয়ানক দারিদ্র্য, রোগ ও দূর্ভিক্ষ। ভারতে ও বাংলায় মুসলমান, দলিত ও মেয়েদের ওপর নির্মম অত্যাচার নেমে আসবে ঘরে ও বাইরে।
রবীন্দ্রনাথ ইতিহাস হবেন।
_____________________
এই অন্ধকারের মধ্যে আমি আমার‌ সীমিত ক্ষমতায় মানুষকে যুক্তি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করার শিক্ষা দিয়ে যাওয়ার কাজ করে যাব যতটুকু পারি। আর কীই বা করা আমার পক্ষে সম্ভব? আমার না আছে মিলিয়ন ডলার, আর না আছে উচ্চ বংশলতিকা। রিচ বা ফেমাস — কোনোটাই আমি নই।
যদি আপনারা চান, ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেন, তাহলে এই হতাশা, বিহ্বলতা এসব দূরে সরিয়ে এই কঠিন সময়ে আমার পাশে থাকুন। না, আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর বা সব‌ সমস্যার সমাধান দেবার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, আমরা একসাথে মিলে কোন একটা রাস্তা ঠিক খুঁজে বের‌ করতে পারব।
হ্যাঁ, এবারে ওরা বিরোধীদের ধ্বংস করবে, মানুষের মনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরী করবে। আমাদের‌‌ অনেকে ওদের‌ সাথে হাত মেলাবে। প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গও‌ আর কয়েক বছর পর‌ ওদের‌ দখলে চলে যাবে। এসবই সত্যি।
কিন্তু, খুব শিগ্গিরি সাধারণ মানুষ, ৯৯%, যারা তাদের ভোট দিয়ে জিতিয়েছে, নিজেদের ভুল‌ বুঝতে পারবে, তাদের বাস্তব জীবনের সংকটের কথা বুঝতে পারবে। সেই চরম বিপদের সময় তাদের যদি সাহায্যের প্রয়োজন হয়, তখন যেন আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যে তৈরী থাকি।
এখনকার মত শুধু এইটুকু মনে রাখুন, যে একদল “দেশভক্ত,” যারা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেনি, একফোঁটা রক্তও দেয়নি, যারা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ, আম্বেদকরকে চিরকাল ঘৃণা করে এসেছে, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে, আর নাথুরাম গডসের মূর্তি গড়েছে, তারাই আজ দেশের দায়িত্বে।
হয়ত,আমাদের বাকী জীবনটা তাদের অধীনেই কাটাতে হবে।
যোগাযোগ রাখুন।
_____________
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
নিউ ইয়র্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here